চট্টগ্রামে পায়খানা বিরোধী আন্দোলন
এমন ঘটনা আর কোথাও ঘটিয়াছে কি না, তাহা মহাকালও বোধ করি জানেন না! এ কাহিনি চট্টগ্রামের, সে চট্টগ্রাম আজকের সুউচ্চ ভবন, জ্যোতির্ময় আলোকসজ্জা ও ব্যস্ত জনস্রোতের শহর নহে। তখন সে গভীর অরণ্যে আচ্ছাদিত, বাঘ-ভালুকের অবাধ বিচরণভূমি। জনবসতি ছিল ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন, পাহাড়ের গায়ে দু-একটি ছাউনি, নদীর ধারে কিছু ঘর, আর খোলামেলা প্রাকৃতিক ব্যবস্থা।
১৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রামে পৌরসভা আইন কার্যকর হইল বটে, কিন্তু পায়খানা ব্যবস্থার বালাই ছিল না। মানুষের সে কী সুখ! প্রকৃতির মাঝে আপন মনে বসিয়া বিশ্রামগ্রহণ, তাহার উপর আবার কোনও রাজকর নাই! কিন্তু বিধাতা যখন বিপদ পাঠান, তাহা গজব হয়েই আসে। এহেন সুখের জীবনে একদিন আসিলেন মিঃ কারকুড নামক এক ইংরেজ শাসক। তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের কালেক্টর, ম্যাজিস্ট্রেট এবং পৌরসভা পরিচালনার সভাপতি। তিনি ভাবিলেন, এ শহরে এত বনবাদাড়, অথচ স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নাই—এ কেমন কথা!
কারকুড মহাশয় তো একেবারে বিলাতি আদব-কায়দার লোক। তিনি যুক্তি দিলেন, "যখন বিলাতে খাবারের হোটেল থাকিতে পারে, তবে চট্টগ্রামে শৌচাগার থাকিবে না কেন?" ব্যস, যেই ভাবা সেই কাজ! এক আদেশ নামাইয়া দিলেন—প্রত্যেক নাগরিককে পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করিতে হইবে, আর তাহার জন্য পৌরকর দিতে হইবে। আহা! এমন কথা শুনিয়া চট্টগ্রামের জনসাধারণের প্রাণে যেন বাজ পড়িল।
তখনকার অধিকাংশ অধিবাসী ছিলেন মুসলমান। তারা ভাবিলেন, এ তো একেবারে অপমান! বংশপরম্পরায় যে কাজ গাছপালা, বনবাদাড়, নদের ধারে হাসিমুখে সম্পন্ন করিতাম, তাহার জন্য কর দিতে হইবে? তাহার উপর আবার ইংরেজ শাসকের আদেশ? এমন কথা সহ্য হয়? ফলাফল, চট্টগ্রামজুড়ে বিক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠিল।
এদিকে কারকুড সাহেব আদেশ মোতাবেক বাঁশের তৈরি চারটি বৃহৎ পায়খানা নির্মাণ করিয়া ফেলিলেন। আরও আনিয়াইয়া আনিলেন বিহারী মেথরদের, তাহারা পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করিবে। কিন্তু চট্টগ্রামের জনগণ কি তাহা মেনে লইবে? তাহারা তো ভিন্ন কিছু স্থির করিয়া ফেলিয়াছে!
পায়খানা-বিরোধী আন্দোলন চরমে উঠিল। লোকেরা দলে দলে জমায়েত হইয়া পৌরসভা অফিস ঘেরাও করিল, কমিশনারদের মারধর করিয়া দিল, আর শেষমেশ তাহারা "লাল বিরিষের" আয়োজন করিল। "লাল বিরিষ" বুঝেন না? এ হইল সেই পদ্ধতি, যেখানে প্রয়োজনীয় জিনিসকে প্রয়োজনহীন করিয়া দেওয়া হয়—অর্থাৎ আগুনে জ্বালাইয়া দেওয়া হয়!
একদিন সকালে দেখা গেল, এক এক করিয়া পাবলিক টয়লেটগুলিতে দাউ দাউ করিয়া আগুন জ্বলিতেছে। মিঃ কারকুড পাইক-পেয়াদা লইয়া একদিকে ছুটিতেছেন, আর দেখিতেছেন, অন্যদিকে আরেকটি টয়লেট পুড়িতেছে। এভাবে চারটি শৌচাগারের মধ্যে তিনটিই ছাই হইয়া গেল। কেবল কাচারিঘরের সামনেরটিই বাঁচিল।
চট্টগ্রামের লোকেরা তো আনন্দে আত্মহারা! পায়খানা দহন দিবস উদযাপন করিতে লাগিল, একে অপরকে অভিনন্দন জানাইল।
কিন্তু কারকুড সাহেব ভাবিলেন, এ নাশকতার নেপথ্যে নিশ্চয়ই কেহ আছেন। সন্দেহের তীর গেল লালচান চৌধুরীর দিকে—তিনি ছিলেন মুসলমানদের প্রিয়জন ও আন্দোলনের এক গোপন সমর্থক।
কারকুড সাহেব লালচান চৌধুরীকে শহরের নিরাপত্তার দায়িত্ব দিলেন, কিন্তু তিনি তাহা পালন করিতে অস্বীকার করিলেন। ফলত, তাহাকে আদেশ অমান্যের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হইল। তিনি যখন আদালতে হাজির হইলেন, তখন তাঁহার জামিনও মিলিল না!
এই ঘটনায় চট্টগ্রামবাসীর রাগ আরও বাড়িয়া গেল। তখন নবীন্দ্র সেন নামে এক ব্যক্তি, যিনি বৃটিশ কমিশনারের পিএস ছিলেন, গোপনে লালচান চৌধুরীর সাহায্যে এগিয়ে আসিলেন। তিনি মামলা পরিচালনার জন্য কলকাতা হইতে বিখ্যাত ব্যারিস্টার মনমোহন ঘোষকে নিয়োগ দিলেন।
ব্যারিস্টার ঘোষ তো আইনজীবী হিসাবে একেবারে শিরোমণি! তাহার তীক্ষ্ণ যুক্তির সামনে ইংরেজ সরকার কাহারো মতো দাঁড়াইতে পারিল না। মামলার এমন গতিবিধি হইল যে বাংলার গভর্নর স্যার রিচার্ড টেম্পল স্বয়ং বিষয়টি দেখিতে বাধ্য হইলেন। তিনি মিঃ কারকুড সাহেবের পদাবনতি করিয়া তাহাকে অন্য জেলায় সহকারী ম্যাজিস্ট্রেট করিয়া পাঠাইয়া দিলেন।
যাহা হউক, ১৮৯৩ সালে পুনরায় পায়খানার কর আরোপের প্রস্তাব আসিল। চট্টগ্রামের লোকেরা আবারও বিদ্রোহ করিল। এবার আরও উত্তপ্ত হইল পরিস্থিতি—কমিশনারগণ মার খাইলেন, পৌর কর্মচারীরা লাঞ্ছিত হইলেন।
কিন্তু ততদিনে চট্টগ্রাম শহর একটু একটু করিয়া বাড়িয়া উঠিতেছিল, "বুইঙ্গা" অর্থাৎ বাইরের জেলা হইতে আগত মানুষের সংখ্যা বাড়িতেছিল। এক সময় তাহারাই পায়খানার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিল।
১৮৯৬ সালে, বহু নাটকীয়তার পর, প্রথমবারের মতো চট্টগ্রামে শৌচাগার কর আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হইল, এবং দীর্ঘ আন্দোলনের যবনিকাপাত ঘটিল।
এই যে চট্টগ্রামের ইতিহাসে পায়খানা লইয়া এত লড়াই-বিবাদ হইল, এমন ঘটনা পৃথিবীর অন্য কোথাও ঘটিয়াছে কি না, তাহা নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার! তবে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, চট্টগ্রামের জনগণের আত্মমর্যাদা ও প্রতিরোধের শক্তি ছিল অতুলনীয়। কর দিয়া পায়খানা ব্যবহার করা, তাহা সে যুগের চট্টগ্রামবাসী কল্পনাও করিতে পারে নাই!
অতঃপর কেহ যদি তোমাকে প্রশ্ন করে, পৃথিবীর ইতিহাসে সবচাইতে ব্যতিক্রমী বিদ্রোহ কোনটি? তাহা হইলে নিশ্চিন্তে বলিও—"চট্টগ্রামের পায়খানা বিদ্রোহ!"
.jpg)
