মহাদেবপুর না মোহাম্মদপুর?—এক বিস্মৃত ইতিহাসের অনুসন্ধান
বাংলার ইতিহাসে এমন অনেক স্থান রয়েছে, যেগুলো যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে হারিয়ে গেছে কিংবা নতুন নামে পরিচিত হয়েছে। তেমনি এক বিস্মৃত নাম চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানাধীন "মহাদেবপুর", যা কালক্রমে হয়ে গেছে "মোহাম্মদপুর"। কিন্তু এই নাম পরিবর্তনের পেছনের ইতিহাস কী? কেন এক সময়ের গুরুত্বপূর্ণ এই স্থান তার পুরনো পরিচয় হারালো? ইতিহাসের পাতায় ডুবে খুঁজতে গেলে আমরা পাই ধর্ম, সংস্কৃতি ও রাজনীতির এক জটিল মিশ্রণ, যা সময়ের স্রোতে ধোঁয়াশায় ঢাকা পড়ে গেছে।
দেয়াং পাহাড়: ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়
কর্ণফুলীর পূর্বে, যেখানে শঙ্খ নদী বয়ে চলেছে, একসময় ছিল এক সমৃদ্ধ নগর— দেবাঙ্গ, দেবগ্রাম, দেবগাঁও এবং বিবর্তিত হয়ে দেয়াং পাহাড় নামে বর্তমানে পরিচিত। একাধিক ধর্ম ও সংস্কৃতির মিলনস্থল এই অঞ্চলকে প্রাচীন কবিরা "রসাঙ্গ নগর" নামে অভিহিত করেছেন, যা একসময় স্বর্গের প্রতিচ্ছবি হিসেবে বিবেচিত হতো।
শঙ্খ নদীর পূর্ব এবং কর্ণফুলী নদীর দক্ষিনপাড় পর্যন্ত ছোট ছোট পাহাড় ও টিলা বেষ্টিত পুরো অঞ্চল দেয়াং পাহাড়ের অংশ।
এই অঞ্চল ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেখানে একসময় বৌদ্ধদের স্বর্ণযুগ শুরু হয়েছিল। বিস্তীর্ণ দেয়াং পাহাড়ের লাল মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে হাজার হাজার কেয়াং (বৌদ্ধ মঠ), রাজবাড়ি এবং বিখ্যাত পণ্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়।
সপ্তম শতাব্দীতে এটি ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম শিক্ষাকেন্দ্র, যেখানে জ্ঞানচর্চা চলত আর্য ভাষায়, যা পরে বাংলা ভাষার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বলা চলে বাংলা ভাষার প্রাক যাত্রা এখান থেকেই শুরু হয়েছিল।
এই অঞ্চলে ছিল শক্তিশালী রাজাদের শাসন। কাইচ্যা রাজার রাজ্য ছিল বড় উঠান গ্রামের অদূরে, যেখানে এখনো তার প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ এবং সৈন্য সামন্তের স্মৃতি "কাইচ্যা ঘোনা" নামে পরিচিত। কর্ণফুলী নদী, যার আদিতম নাম ছিল "পুস্পভদ্রা", কাইচ্যা রাজার বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল এবং পরে পরিচিতি পায় "কাইচ্যা খাল" নামে।
এছাড়াও এই অঞ্চলে হরিকেল রাজ্যের বিষম রাজার শাসন ছিল, যার রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ আজও পাওয়া যায় বড় উঠানের অদূরে বিশ্বমুড়া এলাকায়। তার নির্মিত দেওদীঘি, যা কালের বিবর্তনে "ডেয়াল্ডি" নামে পরিচিত হয়েছে, আজও নীরবে বহন করে অতীতের স্মৃতি।
মহাদেবপুর: নামের ইতিহাস ও পরিবর্তন
এই ঐতিহাসিক এলাকায় একসময় গৌতম বুদ্ধ তার অনুসারীদের নিয়ে আসেন এবং আনোয়ার চাতরী চৌমুহনীর পশ্চিমে এক স্থানে ধর্মসভা করেন,তার স্মৃতি রক্ষায় মোহন দেবতার নামানুসারে ধর্মীয় গুরুত্বের কারণে সেই স্থানটির নাম হয় "মহাদেবপুর"। প্রাচীন দলিলপত্র, জমির রেকর্ড (BS, RS, PS) সবখানেই এই নামের অস্তিত্ব ছিল।
কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার করে এই ঐতিহাসিক স্থানের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় "মোহাম্মদপুর"। এটি নিছক এক নাম পরিবর্তন ছিল না, বরং ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে মুছে ফেলার প্রচেষ্টা।
মহাদেবপুর শুধু এই এক জায়গাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নওগাঁ জেলায়ও একটি মহাদেবপুর রয়েছে, যা বিখ্যাত পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের জন্য। জাতিসংঘ ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে সংরক্ষিত এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হাজার বছরের ইতিহাস বহন করছে। কিন্তু দেয়াং পাহাড়ের প্রাচীন পণ্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়, কেয়াং ও রাজপ্রাসাদ আজ আর অবশিষ্ট নেই—স্মৃতিচিহ্ন তো দূরের কথা, তার নাম পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়েছে।
নাম পরিবর্তনের পিছনে কি লুকিয়ে আছে ইতিহাস মুছে ফেলার প্রয়াস?
বাংলাদেশে বহু স্থানের নাম পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে, বিশেষ করে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কারণে। মহাদেবপুর থেকে মোহাম্মদপুর নামকরণও কি সেই একই ধারাবাহিকতার অংশ?
তথ্য অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, নাম পরিবর্তনের পেছনে কোনো ঐতিহাসিক বা সামাজিক প্রয়োজন ছিল না, বরং এটি ছিল একটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যা মূলত ইতিহাসকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের প্রয়াস মাত্র।
কিন্তু ইতিহাস কখনো মুছে যায় না। সময়ের সাথে কিছু নাম হারিয়ে যেতে পারে, কিছু নিদর্শন ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু সত্য কখনো হারিয়ে যায় না। ইতিহাসকে সংরক্ষণ করা কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা সম্প্রদায়ের কাজ নয়—এটি সমগ্র জাতির দায়িত্ব। কারণ ইতিহাস ধর্মের বিরুদ্ধে নয়, বরং এটি সকলের গৌরবময় অতীতের অংশ।
সত্য উদঘাটন ও ইতিহাস সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা
নাম বদলে ইতিহাস বদলানো যায় না। আজকের মোহাম্মদপুরের আড়ালে চাপা পড়ে আছে মহাদেবপুরের প্রকৃত পরিচয়। আমরা যদি সত্য জানতে চাই, তাহলে প্রয়োজন গবেষণা, ইতিহাস পুনরুদ্ধার এবং সংরক্ষণ।
সারা বিশ্বেই আজ ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো সংরক্ষণের চেষ্টা চলছে, অথচ আমাদের দেশে এক সময়ের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও ধর্মীয় কেন্দ্র দেয়াং পাহাড়ের প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। একে সংরক্ষণ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের ইতিহাস থেকে বঞ্চিত হবে।
নাম বদলানোর মাধ্যমে ইতিহাসকে ঢেকে রাখা সম্ভব নয়। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের উচিত গবেষণার মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে তাদের গৌরবময় অতীত।
"মহাদেবপুর" কেবল একটি নাম নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক সত্য যা আমাদের সংস্কৃতি, শিক্ষা ও ধর্মীয় ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। "মোহাম্মদপুর" নামটি বাস্তবতা হলেও, তার গভীরে রয়ে গেছে এক লুকিয়ে ফেলা অধ্যায়। এই সত্যকে সামনে আনার জন্য আমাদের প্রয়োজন আরও গবেষণা ও সচেতনতা। ইতিহাসকে সংরক্ষণ করা মানে কোনো বিশেষ ধর্ম বা সম্প্রদায়ের ক্ষতি করা নয়, বরং তা সকলের জন্যই কল্যাণকর।
কর্ণফুলীর তীর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা দেয়াং পাহাড় আজও সাক্ষী হয়ে আছে তার হারিয়ে যাওয়া মহাদেবপুরের স্মৃতির—যে নাম ইতিহাসের পাতায় আজও বেঁচে আছে, যদিও বাস্তবে তা মুছে ফেলা হয়েছে।
.jpg)
