গোলাম আজম কি ভাষা সৈনিক ছিলেন?
১৯৪৭ থেকে ১৯৭১-এর স্বাধীনতা আন্দোলন, স্বাধীনতা-পরবর্তী স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪-এর ফ্যাসিবাদবিরোধী বিপ্লব—এই ধারাবাহিকতায় জামায়াতে ইসলামীর ভেল্কিবাজি ও নৈতিক অধঃপতনের তুলনা নেই।
জামায়াতে ইসলামীর ১৯৭১-এর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেই তারা ঘাতক-দালালকূলের শিরোমনি গোলাম আজমকে ভাষা-সৈনিক হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করে মরিয়া হয়ে ওঠে।
আসুন, আমরা ইতিহাসের পাঠ ও গোলাম আজমের নিজের স্বীকারোক্তির আলোকে দেখি—তিনি আসলে কত বড় মাপের ‘ভাষা-সৈনিক’ ছিলেন।
ভাষা আন্দোলনে গোলাম আজম
১৯৪৮ সালের নভেম্বর মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন। ২৭ নভেম্বর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের এক সমাবেশে ভাষণ দেন। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে তাকে একটি মানপত্র দেওয়া হয়, যাতে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়। এই মানপত্র পাঠ করেন তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের সেক্রেটারি গোলাম আজম।
আসলে এটি পাঠ করার কথা ছিল ছাত্র ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট অরবিন্দ বোসের। কিন্তু আশঙ্কা করা হয়, এক হিন্দু ছাত্রের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের দাবিসংবলিত মানপত্র পেশ করলে লিয়াকত আলীর মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে এবং মুসলিম লীগ সরকার নানা ধরনের বিরূপ প্রচারণা চালাবে। এই আশঙ্কায় একজন মুসলিম ছাত্র হিসেবে গোলাম আজমকে তা পাঠ করতে দেওয়া হয়।
গোলাম আজম তখন ছাত্রদের চাপের মুখে পড়ে মানপত্র পাঠে বাধ্য হয়েছিলেন।
এই হলো ভাষা আন্দোলনে গোলাম আজমের ‘বিরাট’ ভূমিকা।
এই প্রসঙ্গে গোলাম আজম তাঁর আত্মজীবনী "আমি জীবনে যা দেখলাম" গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের ৯৬ নম্বর পাতায় সরল স্বীকারোক্তি দিয়ে লেখেন, তার সম্পৃক্ততা নিতান্তই আকস্মিক।
তিনি লেখেন—
"১৯৪৮-৪৯ সালে ইউনিভার্সিটি ইউনিয়নের নির্বাচন না হওয়ায় এ সেশনেও জিএস-এর দায়িত্ব আমার ওপরই রইল। কিন্তু হলে না থাকায় দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে পড়লো। তাই ভারপ্রাপ্ত জিএস হিসেবে নির্বাচিত সদস্যদের একজনের উপর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।
’৪৮-এর ২৭ নভেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর নিকট পেশ করার জন্য একটি স্মারকলিপি রচনার দায়িত্ব দেওয়া হয় সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভিপি আবদুর রহমান চৌধুরীর উপর (যিনি পরবর্তীতে বিচারপতি হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেন)। একটি কমিটি স্মারকলিপিটি চূড়ান্ত করে।
ইউনিভার্সিটি ছাত্র ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ড. সৈয়দ মুয়াযযাম হোসেন তখন বিদেশে থাকায় ভারপ্রাপ্ত ভাইস চ্যান্সেলর জনাব সুলতানুদ্দীন আহমদ সভায় সভাপতিত্ব করেন।
ছাত্র মহাসমাবেশে প্রধানমন্ত্রীর সামনে মেমোরান্ডামটি কে পাঠ করবে তা নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি হয়। ছাত্র ইউনিয়নের ভিপির উপর দায়িত্ব দেওয়া স্বাভাবিক ছিলো। কিন্তু স্মারকলিপিতে পূর্ব পাকিস্তানের অনেক দাবি-দাওয়ার মধ্যে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিটি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ থাকায় সবাই একমত হয় যে, ঐ পরিস্থিতিতে একজন হিন্দুর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে তা পেশ করা মোটেই সমীচীন নয়। কারণ মুসলিম লীগ সরকার রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পেছনে হিন্দুদের হাত আবিষ্কার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয় যে, ছাত্র ইউনিয়নের জিএস গোলাম আজমকেই এ দায়িত্ব পালন করতে হবে।"
(জীবনে যা দেখেছি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৯৬)
অবাক করার মতো বিষয় হলো, ১৯৫২ সালের ৬ মার্চ রংপুর কারমাইকেল কলেজের প্রভাষক থাকা অবস্থায় তাকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার ‘অপরাধে’ গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে দাবি করেন গোলাম আজম নিজেই।
কিন্তু এর স্বপক্ষে গোলাম আজম ব্যতীত অন্য কোনো উৎসে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গোলাম আজম: ভাষা আন্দোলন, উর্দু প্রেম ও জামায়াতের ভেল্কিবাজি
ভাষা আন্দোলনের পর গোলাম আজমের খেদোক্তি
১৯৭০ সালেই তিনি ভাষা আন্দোলনে নিজের সম্পৃক্ততা নিয়ে খুলে আফসোস প্রকাশ করেন।
এই বক্তব্যের উল্লেখ মেলে ১৯ জুন দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায়। সেখানে লেখা হয়:
"পশ্চিম পাকিস্তানের শুক্কুরে ১৮ জুন (১৯৭০) এক সংবর্ধনা সভায় জামায়াত নেতা গোলাম আজম বলেন, উর্দু হলো পাক-ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের সাধারণ ভাষা।
তিনি বলেন, ৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে তিনিও অংশ নিয়েছিলেন, কিন্তু তা ভুল ছিল।"
(সূত্র: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস – ড. মোহাম্মদ হান্নান, পৃষ্ঠা ৩৯৯)
এরপর গোলাম আজম আরও বলেন:
"উর্দু হচ্ছে এমন একটি ভাষা, যার মাধ্যমে ইসলামী শিক্ষার উপযুক্ত প্রচার ও প্রসার সম্ভব। কারণ উর্দু হলো উপমহাদেশের মুসলমানদের সাধারণ ভাষা এবং এতে তাদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সম্পদ সংরক্ষিত রয়েছে।"
তিনি ভাষা আন্দোলনকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দৃষ্টিকোণ থেকে ‘বেঠিক কাজ’ বলেও মন্তব্য করেন।
(সূত্র: দৈনিক আজাদ, ২০ জুন ১৯৭০)
এই বক্তব্যগুলো তিনি দেন এমন সময়, যখন বহু আগেই—১৯৫৬ সালের পাকিস্তান সংবিধানে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
জামায়াতের ভেল্কিবাজি ও দ্বিচারিতা
দেখা যাচ্ছে, জামায়াত নেতা গোলাম আজমের বক্তব্য ও অবস্থানের মধ্যে চরম দ্বিচারিতা ও নৈতিক অধঃপতনের ছাপ স্পষ্ট।
প্রথমে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ, পরে তা ভুল বলে স্বীকার, এরপর নিজেকে ভাষা সৈনিক দাবি করা, আবার এক সময় বাংলা ভাষাকে ‘খোদার শ্রেষ্ঠ দান’ বলে প্রচার করার জন্য মিথ্যাচারপূর্ণ ক্যাসেট প্রকাশ—এসবই জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক জাদুর খেলা।
এমন দ্বিচারিতা জামায়াতের বুনিয়াদি বৈশিষ্ট্য। তাদের ‘গুরু’ হিসেবে খ্যাত মাওলানা মওদূদী-ও একইরকম ভেল্কিবাজি দেখিয়ে রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করেন।
এর সঙ্গে প্রকৃত ইসলামী নৈতিকতার কোনো সম্পর্ক নেই—এ কথা বলাই বাহুল্য।
গোলাম আজমের চোখে উর্দু শ্রেষ্ঠ ভাষা
আজ জামায়াতে ইসলামী ও শিবিরের লোকজন গোলাম আজমকে ‘ভাষা সৈনিক’ বানাতে প্রাণপণ চেষ্টা করছে।
কিন্তু তার বিদেহী আত্মা নিশ্চয়ই অশান্তিতে কাঁপছে, কারণ তিনি উর্দুকেই আজীবন শ্রেষ্ঠ ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
১৯৪৮ সালের সেই মানপত্র পাঠের ঘটনায় শুধু তার মুসলমান পরিচয়টি কাজে লাগানো হয়েছিল। তিনি নিজেও আজীবন উর্দুকে শ্রেষ্ঠ ভাষা হিসেবে ধারণ করেছেন।
তার আত্মজীবনীর ৩য় খণ্ড, ১০৫ পৃষ্ঠায় তিনি লেখেন:
“১৯৭১ সাল থেকে সৌদি আরব, কুয়েত, দুবাই, বাহরাইন, কাতার, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, কানাডা, সিঙ্গাপুর, জাপান প্রভৃতি দেশে সফর করার সুযোগ হয়েছে।
উপমহাদেশে ইসলামী কর্মসূচিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পারস্পরিক যোগাযোগের প্রধান মাধ্যমই হলো উর্দু।
বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের মুসলমানদের বিরাট জনশক্তি এসব দেশে রয়েছে।
তাদের মধ্যে যারা ইসলামী কর্মকাণ্ডে যুক্ত, তাদের যৌথ সমাবেশ হয়, পারস্পরিক মতবিনিময়ের প্রধান ভাষা উর্দু। তাই বাংলাদেশীরাও মোটামুটি উর্দু বুঝে এবং কিছু কিছু বলতেও পারে।”
তিনি আরও লিখেছেন:
“১৯৫০ সালে আমাদের আমীর উর্দুভাষী হওয়ায় উর্দু শোনা ও বোঝার সুযোগ পেয়ে ভালোই লাগল।
উর্দু ভাষার এক প্রকার মিষ্টতা আছে, যার কারণে শুনতে শ্রুতিমধুর লাগে।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনের সময় উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার বিরোধিতা করে উর্দু শিখবো না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
কিন্তু পরে সে ক্ষোভ আর রইল না, উর্দু শেখা শুরু হলো।”
(জীবনে যা দেখেছি, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১১২)
শহীদ মিনার গুঁড়িয়ে দিয়ে উল্লাস
সবশেষে আসা যাক ভাষা-সৈনিক হিসেবে গোলাম আজমকে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টার বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর নিজস্ব অবস্থানের কথায়।
মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শহীদ দিবসের স্মারক শহীদ মিনারটি গুঁড়িয়ে দেয়।
এ কাজকে সমর্থন জানায় গোলাম আজম ও তার দল জামায়াতে ইসলামী।
তারা দাবী করে, শহীদ মিনার হচ্ছে ‘হিন্দুয়ানি প্রথার প্রতীক’।
প্রমাণ হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম-এর দুটি প্রকাশনা (১২ মে ও ১৬ জুলাই) উল্লেখযোগ্য:
১৬ জুলাইয়ের "ইতিহাস কথা বলে" শীর্ষক সম্পাদকীয়তে লেখা হয়:
“আইয়ুব খানের গভর্নর আজম খান ছাত্রদের খুশি করার জন্য যে শহীদ মিনার তৈরি করেন, তাকে পূজা মণ্ডপ বলা যেতে পারে, কিন্তু মিনার কিছুতেই নয়।
যাহোক, সেনাবাহিনী সেই কুখ্যাত মিনারটি ধ্বংস করে সেখানে মসজিদ গড়ে শহীদদের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শনের চেষ্টা করেছে—জেনে দেশবাসী খুশি হয়েছে।”
যে শহীদ মিনারে প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে তারা সবার আগে গিয়ে শ্রদ্ধা জানায়,
সেই মিনারকেই তারা এক সময় ‘হিন্দুয়ানি প্রথার চর্চা’ বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ধ্বংসকে সমর্থন জানিয়েছিল।
এসবই প্রমাণ করে—জামায়াতে ইসলামীর কথাবার্তা, অবস্থান ও ইতিহাস একটি নিখাদ ভেল্কিবাজি।
.jpg)
