স্বাধীনতা নয়, স্বায়ত্তশাসন চাই


 স্বাধীনতা নয়, স্বায়ত্তশাসন চাই—শেখ মুজিব

১৯৫৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ এবং শেখ মুজিবের কর্মকাণ্ড নির্মোহ ও নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করলে জাতির সঙ্গে প্রতারণা, ক্ষমতার লোভ ও ভাগাভাগির চিত্রই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ, জাতির চরম সংকটময় মুহূর্তে শেখ মুজিব চূড়ান্ত প্রতারণার আশ্রয় নেন। তবে দৈবক্রমে চট্টগ্রাম থেকে একজন মেজর জিয়ার আকস্মিক স্বাধীনতার ঘোষণা আওয়ামী লীগের পাকিস্তানের সঙ্গে ক্ষমতার দরকষাকষির সব দ্বার রুদ্ধ করে দেয়। সহজ-সরল বাঙালি শেখ মুজিবকে "জাতির পিতা" বানিয়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ভয়াল শাসনের যাতাকলে জাতি পিষ্ট হয়। শেষ পর্যন্ত ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এ তার শাসনের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে।

ঘূর্ণিঝড় ও মাওলানা ভাসানীর ভূমিকা

বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতার প্রমাণ পেতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯৭০ সালের ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়কার ঘটনাপ্রবাহে।
১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের সাধারণ ও প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এর ২৪ দিন আগে, ১২ নভেম্বর, বাংলা উপকূলে আঘাত হানে এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, সন্দ্বীপ, হাতিয়া, পটুয়াখালী, বরগুনাসহ উপকূলীয় অঞ্চল সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়, এবং প্রায় ১১ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়।
পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে এবং উপদ্রুত এলাকায় কার্যকর কোনো উদ্ধার তৎপরতা চালায়নি।
এ সময় মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ধানমন্ডির একটি নার্সিং হোমে চিকিৎসাধীন ছিলেন। কিন্তু রেডিওতে দুর্যোগের খবর শুনেই চিকিৎসকদের বাধা উপেক্ষা করে ছুটে যান উপকূলীয় অঞ্চলে। টানা ১০ দিন দুর্গত এলাকাগুলো পরিদর্শন করে ২২ নভেম্বর ঢাকায় ফিরে তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে উপদ্রুত এলাকার মানবিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ত্রাণ অব্যবস্থাপনা, তহবিল তছরুপ এবং পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের নির্লিপ্ততার কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান এবং বলেন, লাখো লাশের ওপর দাঁড়িয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করে নির্বাচন আয়োজন অর্থহীন।
পরদিন, ২৩ নভেম্বর পল্টনের বিশাল জনসভায় মাওলানা ভাসানী সরাসরি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বলেন—"স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান জিন্দাবাদ"।

শেখ মুজিবের প্রতিক্রিয়া ও ক্ষমতার রাজনীতি

মাওলানা ভাসানীর এই বক্তব্য দেশে-বিদেশে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। ভারতের রেডিও আকাশবাণী এটিকে স্বাধীনতার ঘোষণা বলে বারবার প্রচার করে। বিদেশী গণমাধ্যম গুলো ফলাও করে প্রচার করে ঘোষণা।
ভাসানীর এই ঘোষণায় অনুপ্রাণিত হয়ে কবি শামসুর রহমান লেখেন স্বাধীনতার প্রথম কবিতা 'সফেদ পাঞ্জাবি'
এদিকে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও শেখ মুজিব তখনও ব্যস্ত ছিলেন ক্ষমতার ভাগাভাগি ও দরকষাকষিতে। মাওলানা ভাসানীর স্বাধীনতার দাবিতে সারা দেশে জনমত গড়ে উঠলে শেখ মুজিব চুপ থাকতে পারলেন না। প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন—"পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা চাই না, আমরা স্বায়ত্তশাসন চাই"।

শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের এই মনোভাব দেখে মাওলানা ভাসানী আরও ক্ষুব্ধ হন। তিনি ও তার দল নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান এবং পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত তৈরিতে দেশব্যাপী প্রচার চালান।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের অন্যতম কারণ ছিল মাওলানা ভাসানীর ন্যাপের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো এবং শেখ মুজিবকে মৌন সমর্থন দেওয়া। কিন্তু নির্বাচনে জয়ের পর শেখ মুজিবের লক্ষ্য ছিল কেবল ক্ষমতা গ্রহণ।

মাওলানা ভাসানীর স্বাধীনতার ডাক

শেখ মুজিব যখন ক্ষমতা বুঝে নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন মাওলানা ভাসানী বারবার বলছিলেন, "শেখ মুজিব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বদলে বাংলার সিপাহসালার হোক"।
১১ জানুয়ারি ১৯৭১, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনা করতে ঢাকায় আসেন। যাওয়ার আগে বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের বলেন—"শেখ মুজিব শিগগিরই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন"।
অন্যদিকে, একই সময়ে রাজশাহীতে বিশাল সমাবেশে মাওলানা ভাসানী শেখ মুজিবকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছিলেন। ভাসানী বুঝতে পেরেছিলেন, শেখ মুজিবের ক্ষমতার লোভ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে আবার প্রতারণার সুযোগ করে দেবে।
জানুয়ারি থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ ক্ষমতার দরকষাকষিতে ব্যস্ত ছিলেন, আর মাওলানা ভাসানী মাঠে-ময়দানে স্বাধীনতার ডাক দিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। তার সমাবেশগুলোতে উচ্চারিত হচ্ছিল "স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান জিন্দাবাদ" স্লোগান, আর মঞ্চে উড়ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা।

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

buttons=(Accept !) days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !