বড় উঠান ও দৌলতপুরের চমকপ্রদ ইতিহাস
বড় উঠান, একটি প্রাচীন জনপদ, যার মাটির নিচে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। নবম শতকের একটি তাম্রলিপির তথ্য অনুসারে, বড় উঠান একসময় হরিকেল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং রাজা কান্তিদেবের রাজধানী হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
এই অঞ্চলের আরেকটি প্রাচীন নাম ছিল বর্ধমান পুর, যা লোকমুখে বিবর্তিত হয়ে বর্ধমানপুর হয়ে বর্তমানে বড় উঠান নামে পরিচিত। বৌদ্ধ ও হিন্দু ঐতিহ্যে বর্ধমানপুরের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে যে এখানে একসময়ে সমৃদ্ধ নগরসভ্যতা বিদ্যমান ছিল।
মোগল বিজয় ও জমিদার পরিবারের উত্থান
১৬৬৬ সালে মোগল সেনাপতি বুজুর্গ উমেদ খান চট্টগ্রাম বিজয়ের পর পর্তুগিজ জলদস্যু ও মগ সৈন্যদের বিতাড়িত করেন এবং বর্তমান চট্টগ্রাম শহরে ঘাঁটি স্থাপন করেন। এই অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষায় তার সহযোদ্ধা শ্যাম রায় বর্তমান বড় উঠান এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং পরবর্তীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে দেওয়ান মনোহর আলী খান নাম ধারণ করেন।
পরবর্তীকালে, মনোহর আলী খানের বংশধররা এই অঞ্চলে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। বিশিষ্ট জমিদারদের মধ্যে ছিলেন:
- জমিদার রুস্তম আলী খান
- জমিদার হোসাইন আলী খান
- জমিদার ফাজিল খান
- জমিদার ইলিয়াছ খান
- জমিদার আমীর আলী খান
- জমিদার আছদ আলী খান
- জমিদার আনোয়ার আলী খান
- জমিদার শের আলী খান
তাদের জমিদারির প্রভাব এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, আনোয়ারা ও কর্ণফুলী এলাকার বহু হাটবাজার ও গ্রামের নাম তাদের স্মৃতিতে এখনো বহন করে।
দৌলতপুর: ঐতিহাসিক ঐশ্বর্যের জনপদ
দেয়াং অঞ্চলের আরেকটি প্রাচীন জনপদ দৌলতপুর, যা একসময় ধন-সম্পদ ও আভিজাত্যের জন্য বিখ্যাত ছিল। ধারণা করা হয়, এই সমৃদ্ধির কারণেই গ্রামের নামকরণ দৌলতপুর হয়েছে।
সুফি দরবেশদের আগমন ও মগদের পরাজয়
মোগল বিজয়ের সময় হযরত শাহ সৈয়দ জালাল উদ্দীন বুখারী (রহ.) তার একদল মুরিদসহ দৌলতপুরে আসেন। তখন এই অঞ্চল মগ জলদস্যুদের দখলে ছিল। শাহ সৈয়দ জালাল উদ্দীন বুখারী, তার পুত্র শাহ সৈয়দ আফজাল বুখারী, শ্যালক শাহ সৈয়দ সুলতান বুখারী (রহ.) ও তাদের সঙ্গীদের সাথে মগদের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে মগরা পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায়।
পরবর্তীতে এই সুফি সাধকরা আনোয়ারা রাডার অফিসের পশ্চিমচাল গ্রামে বসবাস শুরু করেন এবং সেখানে তাদের মাজার স্থাপিত হয়, যা চার পীর আওলিয়ার মাজার নামে পরিচিত।
দৌলতপুরের সাহিত্য ও ধর্মীয় ঐতিহ্য
- এই গ্রামেই জন্মেছিলেন মধ্যযুগের দুই খ্যাতনামা কবি নুরুউল্লাহ ও আছমত উল্লাহ।
- এখানকার পাহাড়ে অবস্থিত দৌলতপুর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
- ইতিহাসবিদদের মতে, মোগল আমল থেকে এখানে ঈদের নামাজের তথ্য পাওয়া গেলেও, এটি তারও পূর্ববর্তী। ধারণা করা হয়, প্রখ্যাত তাবেয়ী হযরত মামুন (রহ.) ও হযরত বোরহান (রহ.) এর নেতৃত্বে এখানে প্রথম ঈদুল ফিতরের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
- আল্লামা হাফেজ জাকের আহমদ রহঃ নামের এক মহৎপ্রাণ মানুষ এখানে দ্বীনের দাওয়াত ও তালিম তরবিয়ত দিয়ে মানুষকে দ্বীন ধর্মমুখী বানিয়েছিলেন, তারই স্মৃতি হিসাবে দৌলতপুর দারুল উলুম দেয়াং পাহাড় মাদরাসা নামে একটি দ্বীনি শিক্ষা কেন্দ্র রয়েছে।
বাজার ও খ্রিস্টান ঐতিহ্য
- দেওয়ান মনোহর আলী খানের বংশধর জমিদার ফাজিল খান তার নামে এখানে ফাজিল খার হাট বাজার প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও প্রচলিত।
- দৌলতপুরেই রয়েছে মরিয়াম আশ্রম নামে বাংলাদেশের সর্বপ্রথম খ্রিস্টান পরিবার ও তাদের গির্জা, যা হাজার বছরের ইতিহাসের সাক্ষী।
বড় উঠান ও দৌলতপুর—এ দুটি জনপদ শুধু আনোয়ারার নয়, পুরো চট্টগ্রামের ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। প্রাচীন রাজ্য থেকে মোগল বিজয়, সুফি সাধকদের আগমন থেকে জমিদারদের শাসন, সব মিলিয়ে এই অঞ্চল এক অনন্য ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক।
.jpg)