মওদূদীবাদ: সাদা কালো

 


মওদূদীবাদ: সাদা কালো

মওদূদীবাদ শব্দটি নিয়ে আমাদের সমাজে ব্যাপক আলোচনা এবং বিতর্ক রয়েছে। বিশেষত, জামায়াত ইসলামী প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর চিন্তা ও মতবাদ নিয়ে বিভিন্ন আলেম, গবেষক এবং ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যে দ্বিমত দেখা যায়। যদিও মওদূদী সাহেব কখনোই নিজের মতবাদকে ‘বাদ’ বা ‘তন্ত্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাননি, তবুও তার সমর্থক ও সমালোচকদের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই শব্দটি প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছে।

মওদূদীবাদীদের প্রতি সমালোচনার মূল বক্তব্য

সমালোচকদের মতে, মওদূদী সাহেব ইসলামের বিভিন্ন মৌলিক বিষয়ে এমন কিছু বক্তব্য দিয়েছেন, যা ইসলামি আকিদা ও বিশ্বাসের বিপরীতে অবস্থান করে। তার অনুসারীদের মধ্যে এমন ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে, তারা মওদূদীর ব্যক্তিগত মতামতকে ইসলামের চেয়ে অগ্রাধিকার দেন। সমালোচকদের দৃষ্টিতে, এটি ইসলামের মূল আকীদা এবং প্রামাণ্য উৎসগুলো থেকে বিচ্যুতির একটি প্রকাশ।

মওদূদী সাহেবের সমর্থকদের দৃষ্টিভঙ্গি

মওদূদীর সমর্থকরা মনে করেন, তিনি একজন ইসলামী চিন্তাবিদ এবং তার মাধ্যমে সমকালীন মুসলিম উম্মাহ ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছে। তার লেখনী ইসলামের সংকীর্ণ ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে কথা বলে এবং অনেক জটিল সমস্যার সমাধান দেয়। তাদের মতে, মওদূদীর সমালোচনা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্ট এবং তার বক্তব্যগুলো ভুল ব্যাখ্যা করা হয়।

পক্ষপাতের অন্তরালে...

মওদূদী সাহেবের চিন্তাধারা এবং মতাদর্শ নিয়ে দুই ধরনের চরমপন্থা লক্ষ্য করা যায়। কেউ কেউ তাঁর সকল কথাকেই বিনা বিচারে গ্রহণযোগ্য মনে করেন, যা নিঃসন্দেহে অন্ধভক্তি। আবার কেউ কেউ তাঁর প্রতিটি কথার মধ্যেই ইসলামবিরোধিতার গন্ধ পান, যা অন্ধ বিরোধিতার শামিল। সুতরাং, যেকোনো ব্যক্তির চিন্তাভাবনা বা মতাদর্শের সমালোচনা হওয়া উচিত নিরপেক্ষ, জ্ঞাননির্ভর, বস্তুনিষ্ঠ, যথাযথ, যথামাত্রায় এবং সংশোধনের উদ্দেশ্যে।
মওদূদী সাহেব একজন প্রথাগত আলেম না হয়েও ইসলামের বহু খেদমত করেছেন। কিন্তু অন্যদিকে, ইসলামের বহু ক্ষতিও করেছেন বলে অনেক আলেমগণ মনে করেন। বিশেষত, আজমতে সাহাবা, ইসমতে আম্বিয়া (নবীগণের নিষ্পাপ চরিত্র) নিয়ে তাঁর বিতর্কিত বক্তব্য এবং তাঁর অনুসারীদের এই বিষয়ে অনড় অবস্থান বিশেষভাবে সমালোচনার যোগ্য। তবে আশ্চর্যজনকভাবে, জামায়াতে ইসলামীর অনুসারীদের মধ্যে মওদূদী সাহেবের সমালোচনা একপ্রকার নিষিদ্ধের শামিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিজস্ব বুদ্ধি-বিবেক দিয়ে ইসলাম শেখার চেষ্টা এবং নিজস্ব বিচারে ইসলামকে ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে মওদূদী সাহেব অনেক ক্ষেত্রেই ইসলামের মূল আকীদা ও বিশ্বাসে আঘাত করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম এবং আম্বিয়ায়ে কেরামগণের (আঃ) ব্যাপারে তাঁর সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি এই ক্ষতির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। কিন্তু তাঁর অনুসারীদের মধ্যে তাঁর সমালোচনা সহ্য করার মতো ধৈর্য নেই। ফলে, যাঁরা সাহাবা ও নবীদের ব্যাপারে সমালোচনার দ্বার উন্মুক্ত করেন, তাঁরাই মওদূদী সাহেবের সমালোচনায় চুপ থাকার অদ্ভুত প্রবণতা দেখান।
এই দ্বৈত মানসিকতার কারণে মওদূদীবাদ একটি স্বতন্ত্র মতবাদ হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এটি একটি এমন ধারা যেখানে সাহাবা ও নবীদের ব্যাপারে সমালোচনার পথ থাকলেও, মওদূদী সাহেবকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখা হয়। এর ফলে, প্রচলিত অর্থে “মওদূদীবাদ” ইসলামি চিন্তাধারার একটি ভিন্ন মতবাদ হিসেবে বিস্তৃতি লাভ করেছে।

নিম্নে মওদূদী সাহেবের ভ্রান্ত আকিদা ও উলামায়ে কেরামের নির্মোহ আকীদা গুলোর চুম্বকাংশ তুলে ধরা হল। প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ও রেফারেন্স যুক্ত করা হয়েছে।

(১) আল্লাহ সম্পর্কে মন্তব্য

ইসলামের শিক্ষা:

মহান আল্লাহ জুলুমমুক্ত। তিনি কোনো ক্ষেত্রেই জুলুমের আশঙ্কাজনিত বিধান দেননি।

সূত্র: সূরা ইউনুস (আয়াত: ৪৪)


মওদূদী সাহেব বলেন:

“যেখানে নর-নারীর অবাধ মেলা-মেশার সুযোগ রয়েছে, সেখানে যিনার কারণে আল্লাহর আদেশকৃত রজমের শাস্তি প্রয়োগ করা নিঃসন্দেহে জুলুম।”

সূত্র: তাফহীমাত ২-২৮১

(২) ফেরেশতা সম্পর্কে মন্তব্য

ইসলামের শিক্ষা:

ফেরেশতাগণ নূরের তৈরি, তারা আল্লাহর মাখলুক এবং তাদের নারী-পুরুষ নির্ধারণ করা যায় না। তারা সবসময় আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকেন।

সূত্র: শরহুল আকায়েদ-১৩৩


মওদূদী সাহেব বলেন:

“ফেরেশতা প্রায় সেই জিনিস, যাকে গ্রীক ও ভারত প্রভৃতি দেশের মুশরিকরা দেব-দেবী স্থির করেছে।”

সূত্র: তাজদীদ ও এহইয়ায়ে দ্বীন-১০

(৩) পবিত্র কুরআন সম্পর্কে মন্তব্য

ইসলামের শিক্ষা:

পবিত্র কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা করা নাজায়িয ও হারাম।

সূত্র: তিরমিযী শরীফ, ২/১১৯


মওদূদী সাহেব বলেন:

“কুরআনের এক একটি বাক্য পড়ার পর, তার যে অর্থ আমার মনে বাসা বেঁধেছে এবং তার যে প্রভাব পড়েছে, সেটি নিজের ভাষায় লেখার চেষ্টা করেছি।”

সূত্র: তাফহীমুল কুরআন, বাংলা ১/১০

(৪) আম্বিয়ায়ে কেরাম (আলাইহিমুস সালাম) সম্পর্কে মন্তব্য

ইসলামের শিক্ষা:

নবীগণ মাসুম অর্থাৎ নিষ্পাপ, তারা গুনাহ থেকে মুক্ত।

সূত্র: শরহুল আকায়েদঃ ১৫২


মওদূদী সাহেব বলেন:

“নবীগণ মাসুম নন। তাদের দ্বারা গুনাহ সংঘটিত হয়েছে।”

সূত্র: তাফহীমাত ২/৪৩

(৫) ঈসা আ.কে আসমানে উত্তোলন সম্পর্কে মন্তব্য

ইসলামের শিক্ষা:

মহান আল্লাহ হযরত ঈসা (আঃ)-কে জীবিতাবস্থায় সশরীরে আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন।

সূত্র: সূরা-আল ইমরান (আয়াত: ৫৫)


মওদূদী সাহেব বলেন:

“হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন বা মারা গেছেন, এ ব্যাপারটি অস্পষ্ট।”

সূত্র: তাফহীমুল কুরআন, উর্দূ, ১/৪২১

(৬) মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে মন্তব্য

ইসলামের শিক্ষা:

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মানবিক দুর্বলতা থেকে মুক্ত।

সূত্র: তরজুমানুস সুন্নাহ্ ৩/৩৫০; শরহুল আকায়েদ-১৩০


মওদূদী সাহেব বলেন:

“রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মানবিক দুর্বলতার বশবর্তী হয়েছেন এবং গুনাহ করেছেন। তাই ‘সূরা নাসর’-এ তাওবা করতে বলা হয়েছে।”

সূত্র: তাফহীমুল কুরআন বাংলা, ১৯/২৯০

(৭) সুন্নাত সম্পর্কে মন্তব্য

ইসলামের শিক্ষা:

রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর আচরণ ও চরিত্র সকল মুসলমানের জন্য উত্তম আদর্শ।

সূত্র: সূরা আহযাব ২১; বুখারী শরীফ ২/১০৮৪


মওদূদী সাহেব বলেন:

“রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সুন্নাত অনুসরণ বিদ‘আত ও ধর্ম বিকৃতির নামান্তর।”

সূত্র: রাসায়েলে মাসায়েল-১/২৪৮

(৮) ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে মন্তব্য

ইসলামের শিক্ষা:

ইসলাম একমাত্র মনোনীত ধর্ম।

সূত্র: সূরা আল ইমরান (আয়াত: ১৯)


মওদূদী সাহেব বলেন:

“ইসলাম কোনো ধর্ম নয় বরং এটি একটি বিপ্লবী মতবাদ।”

সূত্র: তাফহীমাত-১/৬২

(৯) সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে মন্তব্য

ইসলামের শিক্ষা:

সাহাবায়ে কেরাম সত্যের মাপকাঠি।

সূত্র: সূরা বাকারা (আয়াত: ১৩৭); বুখারী শরীফঃ হা. ৩৬৫১


মওদূদী সাহেব বলেন:

“সাহাবায়ে কেরামকে সত্যের মাপকাঠি মনে করা যাবে না।”

সূত্র: দস্তুরে জামায়াতে ইসলামী-৭

(১০) নামাজ ও রোজা সম্পর্কে মন্তব্য

ইসলামের শিক্ষা:

ইসলামের মূল লক্ষ্য নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত কায়েম করা।

সূত্র: বুখারী শরীফ, হাদিস নং-৮


মওদূদী সাহেব বলেন:

“ইসলামী হুকুমতই মূল লক্ষ্য, নামাজ ও রোজা কেবল মাধ্যম।”

সূত্র: জিহাদের হাকিকত-১৬


যে বিষয় গুলো স্পষ্ট করা জরুরি

আলেমগণ বহুবার জামায়াতে ইসলামীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যে, তারা আজমতে সাহাবা (সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা) এবং ইসমতে আম্বিয়া (নবীদের নিষ্পাপতা) সম্পর্কে সুস্পষ্ট অবস্থান ব্যাখ্যা করুক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, জামায়াতে ইসলামী এই আহ্বানে কর্ণপাত না করে বরং মওদূদী সাহেবের সমালোচনাকে দোষের কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বস্তুত, মওদূদী সাহেবের সঙ্গে আলেমদের বিরোধ কোনো রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নয়, যেমনটি অনেকে আজকাল প্রচার করছেন। বরং এটি একটি আদর্শিক দ্বন্দ্ব, যা ঈমান ও কুফরের মধ্যে সীমারেখা নির্ধারণের প্রশ্ন। এখানে মূল বিষয় সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নিরূপণ।
এজন্য, মওদূদী সাহেবের চিন্তাধারা এবং মতাদর্শ নিয়ে আলেমগণ যে আপত্তি তুলে ধরেছেন, তা কোনো ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়। বরং, এটি ইসলামের মৌলিক আকীদা ও বিশ্বাস রক্ষার একটি প্রয়াস। এ ধরনের দ্বন্দ্বকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়া শুধুমাত্র প্রকৃত সমস্যার গুরুত্বকে আড়াল করার একটি প্রচেষ্টা।


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

buttons=(Accept !) days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !