সেন্ট মার্টিন দ্বীপে মার্কিন ঘাঁটি: গুজব না বাস্তবতা?

 

সেন্টমার্টিন দ্বীপে মার্কিন ঘাঁটির কাল্পনিক ছবি:

সেন্ট মার্টিন দ্বীপে মার্কিন ঘাঁটি: গুজব না বাস্তবতা?

বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন দ্বীপ নিয়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের গুজব নতুন নয়। ১৯৯০-৯১ সাল থেকেই এ ধরনের কথা শোনা যায়, এবং সাম্প্রতিককালে এ বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে। কিন্তু, এর বাস্তবতা কতটুকু নির্ভরযোগ্য? 

বিষয়টি নিয়ে তথ্য-উপাত্তসহ বিশ্লেষণ প্রয়োজন।


মার্কিন সামরিক ঘাঁটির বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি। তারা তাদের সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে বিভিন্ন দেশে ঘাঁটি স্থাপন করে।

  • বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৮০টি দেশে ৭৫০টি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
  • এসব ঘাঁটির জন্য কমপক্ষে ৪০,০০০ হেক্টর জমি প্রয়োজন হয়েছে।
  • প্রতিটি ঘাঁটিতে সাধারণত ১০,০০০ থেকে ৪০,০০০ সৈন্য থাকে।
  • এসব ঘাঁটিতে থাকা বিমানবন্দরের রানওয়ের দৈর্ঘ্য কমপক্ষে ১০,০০০ ফুট হতে হয়, যাতে ভারী সামরিক পরিবহন বিমান, যেমন সি-১৩০ হারকিউলিস, অবতরণ করতে পারে।
  • সি-১৩০ হারকিউলিসের ফুল লোড ওজন ১,৫৫,০০০ পাউন্ড, যা র ওজন নেয়া সেন্টমার্টিনের জন্য অসম্ভব বলা চলে।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপের সীমাবদ্ধতা

সেন্ট মার্টিন দ্বীপের ভৌগোলিক এবং কাঠামোগত অবস্থা মার্কিন সামরিক ঘাঁটির জন্য একেবারেই অনুপযুক্ত। জীবন্ত শৈবাল দ্বারা গঠিত এই দ্বীপ পর্যটকদের চাপ সামলাতে মরি অবস্থা,  সামরিক ঘাটি দূর কি বাত।

  1. দ্বীপের আয়তন:

    • সেন্ট মার্টিন দ্বীপের মোট আয়তন ছেঁড়াদ্বীপসহ মাত্র ৪৩০০ হেক্টর, যা মার্কিন ঘাঁটির প্রয়োজনীয় জায়গার তুলনায় ৮% কম।
    • এমনকি রানওয়ের জায়গা পর্যন্ত হবে না।
  2. মৃত্তিকা গঠন:

    • দ্বীপটির মাটির উপরের অংশ বালুতে পূর্ণ, আর মাত্র ৩ ফুট নিচে জীবন্ত প্রবাল এবং শৈবাল স্তর।
    • এ ধরনের দুর্বল ভূমিতে রানওয়ে বা স্থায়ী সামরিক অবকাঠামো নির্মাণ প্রায় অসম্ভব।
  3. মহীসোপানের গভীরতা:

    • দ্বীপের চারপাশে পানির গভীরতা অত্যন্ত কম।
    • এমনকি ফ্রিগেট বা ডেস্ট্রয়ারের মতো মাঝারি আকারের যুদ্ধজাহাজও সেখানে ভিড়তে পারবে না, ফ্রিগেট কিংবা ডেস্ট্রয়ার ভিড়তে না পারলে এমন ঘাটির প্রয়োজন মার্কিনীদের নেই।

পরিবেশগত ঝুঁকি

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ এবং পরিবেশগত দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল।

  • প্রবাল প্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্বীপটির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে।
  • জলবায়ু পরিবর্তন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সেন্ট মার্টিন ইতিমধ্যেই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
  • ভারী সামরিক কার্যক্রম দ্বীপটিকে তলিয়ে দিবে যে কোন মুহুর্তে। 

রাজনীতি ও কূটনৈতিক বাস্তবতা

বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বাস্তবতাও এই গুজবের ভিত্তিকে দুর্বল করে।

  • যদি সম্ভব হত:
          যদি সেন্টমার্টিন দ্বীপে মার্কিন ঘাটি স্থাপন সম্ভব হত,তবে শেখ হাসিনা সর্বাগ্রে বিক্রি করে          দিত,কারণ ক্ষমতার কাছে শেখ হাসিনার কাছে সবই নস্যি, ইতিমধ্যে সে আপদমস্তক ভারতের কাছে বিক্রি হয়ে আছে,
  • মার্কিন-বাংলাদেশ সম্পর্ক:
    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করত, তবে তা সেন্ট মার্টিনের মতো ভৌগোলিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দ্বীপে নয়, বরং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হতো।
  • যদি প্রয়োজন হত,তবে মার্কিনিরা বহু আগেই দখল করে ফেলত। তা ছাড়া এই অঞ্চলে তাদের নিরাপত্তায় বহু শক্তিশালী ঘাটি রয়েছে, নতুন করে ঘাটি করার ব্যাপারে তারা আগ্রহী নয়।

গুজবের পেছনের কারণ

সেন্ট মার্টিনে মার্কিন ঘাঁটির গুজব সাধারণত রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা বা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ভিত্তিতে ছড়ানো হয়।

পতিত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা একতরফা নির্বাচনের আগ মুহুর্তে বলেছিলেন "সেন্টমার্টিন দিয়ে দিলেই আমার ক্ষমতায় থাকার কোন সমস্যা নেই, আমি দেশের স্বার্থ বিক্রি করিনি বলে মার্কিনিরা আমার বিরুদ্ধে লেগেছে"

কথাটি পরিপূর্ণ মিথ্যাচার এবং দেশের মানুষকে বোকা বানানোর জন্য শেখ হাসিনার অপকৌশল ছিল, তৎক্ষনাৎ মার্কিন মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার এমন বক্তব্যকে প্রত্যাখান করেছিলেন।

শেখ হাসিনার কলংকজনক পলায়নের পর আওয়ামী গুজববাজ সন্ত্রাসীরা আবার সেন্টমার্টিন তত্ত্ব হাজির করেছে।

সেন্টমার্টিন অস্তিত্ব নিয়ে সচেতন না হয়ে নির্মম রাজনৈতিক রসিকতা করার পেছনেও কারণ আছে,

  1. সরকারবিরোধী প্রচারণা:
    • সরকারের বিরুদ্ধে জনমনে অসন্তোষ তৈরি করা।ব্যাপক সন্দেহ ডুকিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করা।
  2. আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র:
    • চীন ও ভারতের প্রভাবের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ ছড়ানো। 
    • এ অঞ্চলে রাজনৈতিক সন্দেহ অবিশ্বাস তৈরী করা।

বাস্তবতা যাচাই

সেন্ট মার্টিনে মার্কিন ঘাঁটি স্থাপন কেবল গুজবই নয়, এটি ভৌগোলিক এবং বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

  • দ্বীপের আয়তন, মাটির গঠন, এবং পরিবেশগত ঝুঁকি এমন একটি প্রকল্পকে একেবারে অচল করে দেয়।
  • কৌশলগত দিক থেকেও এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অব্যবহারযোগ্য।


সেন্ট মার্টিন দ্বীপে মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনের গুজবের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। এমন ভ্রান্ত ধারণা ছড়ানোর পরিবর্তে আমাদের উচিত দ্বীপটির পরিবেশ রক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া।

তথ্য-সচেতনতা এবং পরিবেশ রক্ষার প্রতি আমাদের দায়িত্ববান হওয়া প্রয়োজন।

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

buttons=(Accept !) days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !