মনসুর হাল্লাজের আনাল হক

 


মনসুর হাল্লাজের আনাল হক

ইসলামি মরমিবাদের সবচেয়ে বিতর্কিত ব্যাক্তিত্ব আবুল মুগিত আল হোসাইন ইবনে মনসুর আল হাল্লাজের জন্ম ৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে ফারস প্রদেশের আল বাইজার কাছে।

তিনি ব্যাপক ভ্রমন করেছেন, প্রথমে তুসতার,তারপর মক্কা,সেখান থেকে খুজেস্তান খোরাসান,ট্রানসক্সোনিয়া,সিস্তান, ভারত ও তুর্কিস্তান। 

শেষে তিনি বাগদাদে ফিরে এলেন। সেখান থেকে খোদার সাথে এক হওয়ার সাহসী প্রচারণা করায় অবতারাবাদে বিশ্বাসের অভিযোগে গ্রেফতার হলেন।

তারপর নির্মমভাবে ২৯ জুলকাদা (আরবী মাস) ৩০৯ হিজরী (৮ মার্চ ৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে নিহত হন।

বেশ কিছু বই ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কবিতা লিখে মুসলিম কিংবদন্তিতে খোদায় মত্ত প্রেমিকের আদি পুরুষ হিসাবে ইতিহাস হয়ে আছেন।

হোসাইন এ মনসুর,হাল্লাজ (পশমবুননকারী) নামে পরিচিত ছিলেন।

প্রথমে তুসতার এলেন, এখানে প্রথমে দুই বছর সোহেল ইবনে আবদে আল্লাহর সেবা করেন।

তারপর তিনি বাগদাদ রওনা হলেন,প্রথম ভ্রমনের সময় বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর।

তারপর বসরায় গিয়ে আমর ইবনে উসমানের সাথে যোগ দিয়ে ১৮ মাস কাটালেন।

য়াকুব এ আকতা তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিলেন।

এতে আমর ইবনে উসমান নারাজ হলেন,তাই হাল্লাজ বসরা ছেড়ে বাগদাদে এসে জোনায়েদের সাথে দেখা করলেন।

জোনায়েদ তাকে নিরবতা ও নিস্বঃঙ্গতার পরামর্শ দিলেন। কিছুদিন জোনায়েদের সঙ্গে থেকে হেজাজ রওনা দিলেন।

মক্কায় রইলেন এক বছর,তারপর ফিরে এলেন বাগদাদে। একদল সুফী এসে জোনায়েদের কাছে কিছু প্রশ্ন করলেন। জোনায়েদ কোন উত্তর দিলেন না।

জোনায়েদ হাল্লাজকে বললেন:- সময় আসবে, তুমি এক টুকরো কাঠ রক্তের রঙে রাঙাবে"

উত্তরে হাল্লাজ বললেন  "

আমি যে দিন এক টুকরো কাঠ রঙের রঙ্গে রাঙাবো, সেদিন আপনার পরনে থাকবে যাজকের পোষাক"


ঘটনা সত্যি তাই হল, একদিন যখন সামনের সারির পন্ডিতেরা রায় দিল, হাল্লাজকে অবশ্যই মৃত্যুদন্ড দিতে হবে,তখন জোনায়েদের পরনে ছিল সুফির পোশাক। 

তিনি হাল্লাজের মৃত্যু পরোয়ানায় সই করলেন না,

খলিফা নির্দেশ দিলেন জোনায়েদের স্বাক্ষর জরুরি। 

জোনায়েদ তাই যাজকের পোষাক পরলেন,মাথায় দিলেন পাগড়ী। তারপর মাদরাসায় গিয়ে পরোয়ানায় স্বাক্ষর করলেন।

তিনি লিখলেন " বাইরে দেখে আমরা বিচার করি,ভেতরের সত্য শুধু খোদা জানেন "

জোনায়েদ উত্তর এড়িয়ে যাওয়ায় হাল্লাজ বিরক্ত হয়ে অনুমতি না নিয়েই তুসতার গিয়ে এক বছর রইলেন, সেখানে সবার কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন,

তিনি বহাল মতাদর্শ পাত্তা দিতেন না,তাই ধর্মতাত্ত্বিকরা তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হলেন।

এরমধ্যে আমর ইবনে উসমান হাল্লাজের কুৎসা রটনা করে খুলিস্তানের লোকদের প্রতি চিঠি পাঠালেন।

হাল্লাজও ততদিনে সেই জায়গাতে ক্লান্ত হয়ে উঠলেন।

সুফি পোশাক ছুটে ফেলে,সাধারণ পোশাক পরে,দুনিয়াবী লোকের সঙ্গ নিলেন।

সেই সময় তিনি কাটিয়েছেন খোরাসান,ট্রানসক্সোয়ান ও কিছুটা সিস্তানে।

এরপর হাল্লাজ আহওয়াজ এলেন, এখানে তার মরমিবাদের প্রচারণা অভিজাত এবং সাধারণের কাছে স্বীকৃতি পেল।

তিনি মানুষের রহস্যের কথা বলতেন,তাকে তাই নাম  দেওয়া হল 'রহস্যর বুননকারী'।

এরপর তিনি দরবেশের জীর্ণ বসনে পবিত্র ভূমির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন,সঙ্গে একই সাজে ছিল বহু সঙ্গী। 

মক্কায় তাকে য়াকুব পাহারজুরী তাকে জাদুকর বলে খারিজ করলেন।

তাই তিনি বসরা তারপর আহওয়াজ চলে এলেন।

তারপর তিনি ঘোষণা দিলেন 'আমি বহু ঈশ্বরের দেশে যাচ্ছি, মানুষকে এক ঈশ্বরের পথে ডাকতে'

তাই তিনি ভারত গেলেন, তারপর ট্রানসক্সোনিয়া থেকে চীন,মানুষকে খোদার পথে ডাকলেন,তাদের জন্য লিখলেন।

যখন তিনি পৃথিবীর সেই সব দূর প্রান্ত থেকে ফিরে এলেন,তারা তাকে চিঠি লিখতেন।

ভারতীয়রা তাকে ডাকতেন 'আল মুগিত' বলে,চীনারা 'আবুল মুইন' খোরাসানিরা 'আবুল মুহর' ফারসবাসীরা 'আবু আবদুল্লাহ' খুজেস্তানিরা 'হাল্লাজে আসরার' বলে।

বাগদাদে তাকে বলা হত 'মোসতালেম' বসরায় 'মোখাবার' বলে।

তারপর হাল্লাজের নামে বহু গল্প মুখে মুখে ঘুরে বেড়াতে লাগল।

তাই তিনি আবারো মক্কায় গিয়ে দুই বছর থাকলেন।

যখন ফিরে এলেন,তখন তার অবস্থা অনেক বদলে গেল।

তিনি তখন অন্য মানুষ,  তিনি মানুষ এমন ভাবে সত্যর পথে ডাকলেন,যা কেউ বুঝতে পারলেন না।

জানা যায় তার ধর্ম দর্শনের কারণে তিনি ৫০টি শহর থেকে বহিস্কৃত হয়েছিলেন।


বিস্মিত মানুষ দুই দলে ভাগ হয়ে গেল,তার বিরোধীরা ছিল অসংখ্য এবং সমর্থক অগণন।

তারা তার বহু অলৌকিক কাজ দেখল,মুখে মুখে কথা ছড়াল,শেষ পর্যন্ত পৌছালো খলিফার কানে।

সবশেষে সবাই একমত হল যে "আনাল হক ( আমিই সত্য) বলার অপরাধে তাকে মৃত্যুদন্ড পেতে হবে।

লোকজন হাল্লাজের দিকে চিৎকার করে বলল " বল তিনিই সত্য"

উত্তরে হাল্লাজ বলল " হ্যা, তিনিই সব,তোমরা বলছ তিনি হারিয়ে গেছে, অথচ হারিয়েছে এই হুসাইন, সমুদ্র কমে না,যায় না শুকিয়ে"।

লোকজন তখন ধর্মনেতা জোনায়েদকে বলল "হাল্লাজের এসব রহস্যময় কথার গোপন অর্থ আছে"

জোনায়েদ উত্তরে বললেন "ওকে হত্যা করা হোক, এখন গোপন অর্থের কথা বলার সময় নয়" 

তখন একদল ধর্মতাত্ত্বিক একজোট হয়ে হাল্লাজের কথা বিকৃত করে মোতাসেমের কাছে বলল, এমনকি উজির আলি ইবনে ইসার কাছেও হাল্লাজের বিরুদ্ধাচারণ করাল।

খলিফা হাল্লাজকে কারাগারে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দিল,সেখানে কাটল এক বছর।

কিন্তু তিনি কারাগারে বসেও লোকজনের সমস্যার সমাধান করতেন।

তারপর তাকে বাধা দেয়া হল, পাচ মাস তার কাছে কেউ আসতে কিংবা তিনি কারো কাছে যেতে পারলেন না,একবার এলেন ইবনে আতা,আরেকবার ইবনে খফিক।

সুযোগ পেয়ে ইবনে আতা তাকে বললেন 'গুরু,আপনার বলা কথার জন্য ক্ষমা চান, তাহলে মুক্তি পেয়ে যাবেন,

উত্তরে হাল্লাজ বলল "আমার মাঝ হতে যিনি এসব কথা বলছে, তাকে বল ক্ষমা চাইতে"

ইবনে আতা কথাটি শুনে কান্নায় ভেঙে পড়লেন, বললেন আমরা "হাল্লাজের একাংশের সমান নই"

বলা হয় যে, কারাবাসের প্রথম দিন কারারক্ষীরা রাতে তাকে কামরায় ফেল না,সমস্ত কারাগার তন্ন তন্ন করে খুজেও পাওয়া গেল না।

দ্বিতীয় রাত ছিল আরো ভয়াবহ,  তিনিসহ তার কামরা কারাগার থেকে গায়েব হয়ে যায়।

তৃতীয় রাতে এসে তাকে যথাস্থানে পাওয়া যায়।

"প্রথম রাতে আপনি কই ছিলেন? দ্বিতীয় রাতে আপনিসহ পুরো কারা প্রকোষ্ঠ কোথায় উধাও হয়ে গেছিল?

এখন সব ফিরে এসেছে আপনার সঙ্গে, এসবের মানে কি?

'প্রথম রাতে' উত্তর দিলেন 'আমি সাক্ষাতে ছিলাম,তাই এখানে ছিলাম না"।

"দ্বিতীয় রাতে সাক্ষাৎ এখানেই ছিল" তাই কারা প্রকোষ্ঠসহ আমি গায়েব ছিলাম।

"তৃতীয় রাতে আমাকে ফেরত পাঠানো হল যেন শরীয়ত রক্ষা পায়, এসো,এবার তোমরা তোমাদের কাজ করো"।


হাল্লাজ আটক হওয়ার সময় কারাগারে ৩০০ বন্ধী ছিল, সে রাতে তিনি তাদের বললেন 

" বন্ধীগন, আমি কি তোমাদের মুক্ত করব?"

তারা বলল " তুমি নিজেই নিজেকে মুক্ত করতেছো না কেন?"

উত্তর দিলেন "আমি খোদার বন্ধী, আমি পরিত্রাণের প্রহরী,তোমরা চাইলে আমি এক ইশরায় সব শেখল খুলে দিতে পারি"

হাল্লাজ আঙুল দিয়ে ইশারা করলেন, সব শিকল ঝনঝন করে খুলে গেল।

"এবার আমরা কোথায় যাব? কারাগারের দরজা তালাবন্ধ" বন্ধীরা বললেন।

হাল্লাজ আবার ইশারা করলেন, কারাগারের দেয়াল ধসে পড়ল, " এবার তোমাদের পথে যাও "  বন্দীদের বললেন।

তারা জানতে চাইল " আপনি আসবেন না আমাদের সাথে? " 

" না " হাল্লাজ উত্তর দিলেন "তার সঙ্গে আমার গোপন কথা আছে, যা ফাসিকাষ্ঠে না চড়ে বলা যাবে না"

পরদিন সকালে কারারক্ষীরা জানতে চাইল " বন্ধীরা সব কোথায়?

" আমি তাদের মুক্ত করে দিয়েছি" হাল্লাজ উত্তর দিলেন।

ওরা জানতে চাইল, আপনি গেলেন না কেন?

" খোদা আমাকে তিরস্কার করবেন, তাই আমি রয়ে গেছি " হাল্লাজ উত্তর দিলেন।

এবার সকল খবর খলিফার কানে গিয়ে পৌছালো।

খলিফা চিৎকার করে বলল " ওকে লাঠিপেটা কর,যতক্ষণ না বশ মানো, নয়তো চারিদিকে দাঙ্গা ছাড়িয়ে পড়বে।

হাল্লাজকে তিনশো দোররা মারা হল, প্রতিটি দোররার

 শব্দের সাথে শোনা গেল কে যেন বলছে "হে মনসুরের পুত্র ভয় পেয়ো না"

এরপর হাল্লাজকে ক্রুশবিদ্ধ করার জন্য মাঠে নিয়ে যাওয়া হল।

তেরোটি শেকল পরে হাল্লাজ বুক চিতিয়ে ঠিক ভবঘুরের মত দুই হাত নেড়ে নেচে নেচে পথ চললেন।

তারা জিজ্ঞেস করল "এতো গর্ব নিয়ে চলছো কেন?

তিনি উত্তর দিলেন " কারণ আমি কসাইখানায় যাচ্ছি"

তারপর পরিস্কার কন্ঠে উচ্চারণ করলেন :

"আমার আশীর্বাদ ধন্য সঙ্গীদের

সংকীর্ণ সমানতার দোষে দোষী করো না।

উদার আপ্যায়নকারী অথিতিদের যেমন

তেমনি পান করিয়াছেন তিনি আমায়;

আর যখন পানপাত্র পরিপূর্ণ হল

তিনি চেয়ে পাঠালেন তরবারি আর কাফন।

কঠোর বিধানদাতার সাথে বসন্তকালে,

বুদ্ধি চাপিয়ে পান করার এই তো পরিণতি"


তিনি ক্রুশে সিড়িতে চুমু খেয়ে পা রাখলেন,

লোকজন বিদ্রুপ করে বলল "কেমন লাগছে?

তিনি উত্তর দিলেন " সত্য মানবের আরোহন ফাসিকাষ্ঠে পৌছায়" 

তার কোমরে জড়ানো ছিল ছোট্ট এক টুকরো কাপড়,কাঁধে চাদর।

মক্কার দিকে হাত তুলে তিনি খোদার সাথে ভাব বিনিময় করলেন।

" তিনি যা জানেন, কোনো মানুষ তা জানে না" বলে তিনি ফাসিকাষ্ঠে আরোহন করলেন।

তার একদল অনুসারী এসে জানতে চাইল " আমরা যারা আপনার অনুসারী এবং যারা আপনাকে দোষী বলে পাথর ছুটবে,তাদের সম্পর্কে কিছু বলুন"

উত্তর এলো, " ওরা দ্বিগুন, আর তোমরা এক গুন পুরস্কার পাবে, তোমরা শুধু আমার মঙ্গল ভাবো, কিন্তু ওরা শরীয়তের কঠোরতা রক্ষায় এক খোদার বিশ্বাসের শক্তি দিয়ে চালিত"

ধর্মীয় নেতা শিবলী এলেন, হাল্লাজের মুখোমুখি দাড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে বললেন " আমরা কি তোমাকে বরণ করিনি?

তারপর প্রশ্ন করলেন " ও হাল্লাজ, সুফিবাদ কি?"

"তুমি যা দেখছ, তা এর সামান্য একাংশ" উত্তর এল।

শিবলী জানতে চাইলেন "এর উচ্চতম অংশ কি?

হাল্লাজ উত্তর দিলেন " এই অংশে তুমি পৌছাতে পারবে না"


যখন সমস্ত দর্শক হাল্লাজের দিকে পাথর ছুড়ে মারা শুরু করল, তখন শিবলী নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে একটা গোলাপ নিক্ষেপ করল।

মনসুর গোলাপের আঘাতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

তখন সবাই জানতে চাইল "এত পাথরের আঘাতে তুমি কোন শব্দ করলে না, অথচ সামান্য একটা ফুলের আঘাতে দীর্ঘশ্বাস ফেললে! কেন?

" কারণ যারা পাথর ছুড়ছে, তারা জানে না কি করছে, তাদের অজুহাত আছে,

কিন্তু শিবলীর ছুটে দেয়া গোলাপ,পাথরের চেয়েও কঠিন, কারণ সে জানে এবং বুঝে।

তার আঘাত করা অনুচিত "

যখন হাল্লাজের দুই হাত কাটা হল,তখন তিনি হাসলেন।

কসাইগণ ক্রুদ্ধস্বরে জানতে চাইল হাসলে কেন?

মনসুর হাল্লাজ উত্তর দিলেন "শেকলে বাধা মানুষের হাত কাটা সহজ,রাজ সিংহাসনের মাথা থেকে উচ্চআকাংখার মুকুট সরিয়ে দেয় যে সগুনের হাত,সেই হাত যে কাটতে পারে সেই ই সত্যিকারের মানুষ "

এবার তার দুই পা কাটা হল, তিনি হাসলেন,বললেন "এই দুই পা দিয়ে আমি পৃথিবীর অনেক পথে হেটেছি,আমার আরো দুই পা (অদৃশ্য)  দুই জগতের মাঝ দিয়ে এখনো পথ চলতেছে,যদি পারো সেই দুই পা কাটো"

তারপর তিনি কাটা হাতের বাহু দিয়ে মুখ ঘষলেন, তার মুখ রক্তে রঞ্জিত হল।

জানতে চাওয়া হল কেন এমন করলে?

"অনেক রক্ত ঝরেছে" তিনি উত্তর দিলেন "আমি জানি আমার চেহেরা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে,পাছে ভাবো ভয় পেয়ে গেছি,তাই রক্ত মাখালাম যেন তোমাদের চোখে গোলাপ রাঙা দেখায়,নিজ রক্তই বীরের প্রসাধন"

তারপর তিনি এক বাহু দিয়ে অপর বাহুতে রক্ত মাখলেন, জিজ্ঞেস করা হল কেন এমন করলে?

"অজু করে পবিত্র হচ্ছিলাম"

"কিসের অজু"

হাল্লাজ উত্তর দিলেন " রক্ত না হলে প্রেমের নামাজের অজু সম্পন্ন হয় না "

এরপর তার চোখ দুটো উপড়ে ফেলা হল, জনতার কেউ  উল্লাস করল,কেউ কাদলো আর কেউ পাথর ছুটল।

তারপর তার জিব কাটতে এগিয়ে গেল জল্লাদ।

"একটু ধৈর্য্য ধরো, একটা কথা বলার সময় দাও" হাল্লাজ অনুরোধ করলেন।

তারপর আকাশের দিকে মুখ তুলে বললেন "হে খোদা,তোমার খাতিরে ওরা আমায় যে যন্ত্রণা দিচ্ছে, তার জন্য তুমি এদের ত্যাগ করো না,তোমার দয়া থেকে এদের বঞ্চিত করো না,তোমার প্রশংসা সব।

তোমার দিকে চলছিলাম বলে ওরা আমার পা কেটেছে,শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করলেও তারা আমাকে ফাসিকাষ্ঠের চূড়ায় তুলে ধরেছে,আমিই দেখেছি তোমার মহিমা"

এবার তারা হাল্লাজের নাক ও কান কাটল। এক বৃদ্ধ কলসি নিয়ে সেই পথে যাচ্ছিল, হাল্লাজের পরিণতি দেখে সে চিৎকার করে বলল " মারো মারো, সামান্য এক পশমবুননকারী কিনা খোদা দাবী করে"



হাল্লাজের বলা শেষ কথা ছিল "সেই একেরই প্রেম,একেরই একাকীত্ব "

তারপর পড়লেন:

"যারা বিশ্বাস করে না, 

তারা চায় দ্রুত এগোতে,

কিন্তু বিশ্বাস আছে যার

তারা এগোতে ভয় পায়।

জানে এটাই সত্য"

এই ছিল শেষ কথা, তারপর জিব কাটা হল, মাথা কাটা হল মাগরিবের নামাজের সময়, তখনও তিনি মৃদু হাসতেছিলেন, তারপর গত হলেন।

সমবেত জনতা চিৎকার করে উঠলেন,হাল্লাজ নিয়তির পানপাত্র সমর্পনের সীমানায় নিয়ে গেলেন।


তার প্রতিটি ছিন্ন অঙ্গ থেকে শব্দ এল "আনাল হক"

পরদিন ধর্ম যাজক ও খলিফার তরফ থেকে ঘোষণা এল "হাল্লাজের জীবনের চেয়ে মৃত্যুতে কেলেঙ্কারি আরো বাড়বে"

তাই হাল্লাজের অঙ্গ প্রত্যাঙ্গ তেল ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়ানো হল।

এই সময় সেই পোড়া ছাই থেকেও শব্দ এল "আনাল হক"

এমনকি তার ঝরে পড়া প্রতিটি রক্তবিন্দু মাটিতে পড়ে ফুটে উঠেছিল "আল্লাহ"

লোকজন হতবাক হয়ে সেই ছাই দজলা নদীতে ভাসিয়ে দিল।

নদীতে সেই ছাই ভেসে উঠে চিৎকার করতে লাগল "আনাল হক"

হাল্লাজ ভবিষ্যত বানী করছিল "ওরা যখন আমার দেহ ভস্ম দজলা নদীতে ভাসাবে, তখন দজলা নদীর বান এসে বাগদাদ শহর ধ্বংসের সম্মুখীন হবে,তখন আমার পোশাক বিছিয়ে দিও, নয়তো বাগদাদ শহর ধ্বংস হয়ে যাবে"

ঘটনা সত্যি তাই ঘটল, তখন লোকজন হাল্লাজের পোশাক বিছিয়ে দিল, দজলা নদী শান্ত হল, ছাই থেকে "আনাল হক" শব্দ আসা বন্ধ হল।

লোকজন সব একত্রিত করে সমাধিস্থ করল।

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

buttons=(Accept !) days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !