মহাবীর বীর তৈমুর লঙ্গকে থামিয়ে দিয়েছিল যে কবি ও কবিতা।

 


মহাবীর বীর তৈমুর লঙ্গকে থামিয়ে দিয়েছিল যে কবি ও কবিতা।


হাফিজের কালাটা খুব গোলযোগপূর্ণ, গোটা ইরান বা পারস্য বিভিন্নভাবে বিভিন্ন স্থানে  বাঘে আক্রান্ত গরুর পালের মতো ছিল। যিনি যেখানে পারেন কর্তৃত্ব কায়েমের খায়েশে খামচে কিছু ভূমিখন্ড দখল করে নিজেকে সুলতান বা অধিপতি বলে ঘোষণা দিয়ে সিংহাসন অধিকার করেছেন, হয়েছে ঠিক সে সময় অন্য একজন তাকে তাড়িয়ে অনুরূপ সুলতান হয়ে বসেন কিছুদিনের জন্য। 

অবশ্য কয়েকজন শক্তিশালী  অধিপতি বেশ কিছু দখলদারিত্ব বজায় রাখতে পেরেছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম শাহ সুজা ও আবু ইসহাক, এ দু’জন  আবার হাফিজের ঘনিষ্টতাও পেয়েছিলেন কিছু দিনের জন্য। হাফিজ তাদের জন্য কাসিদার রচনা করেছেন, তারাও হাফিজের কাব্যের যথেষ্ট সমঝদার ছিলেন; তাদের মধ্যে আবু ইসহাক হাফিজের ঘনিষ্ঠতর ছিলেন। আবু ইসহাক নিজেকেও কবি ছিলেন,তবে একটি মহাবাঘ্রের আক্রমন তখনই অপ্রত্যাশিত ও অবধারিত ছিল,সেই মহা বাঘ্র হলেন ইতিহাসের দূদূর্ষ  সমরনায়ক তৈমুর লঙ্গ, এই মহাবীর এশিয়া তছনচ করার প্রক্কালে ১৩৮৭ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যে আক্রমন করেন এবং সমস্ত দেশ ধ্বলস্তুপে পরিনত করেন, সে সময়ে ইরানে বিভিন্ন নগরে এক একেকজন অধিপতি "গায়ে মানে না আপনি মোড়লের মতো" গেট হয়ে বসেছিলেন বিশেষত ইরজেরোমায়, ইরানিজান, শাম, আখলাত, ওয়ান, সালমাস, তুর্মিয়া প্রভৃতি অঞল তৈমুরের হুংকারেই দখল হয়ে গেল।পারস্যের জয়নাল আবেদিন কৃপাণ হাতে তৈমুরকে  বাধা দিতে গিয়ে সহজেই পরাস্ত হন এবং প্রাণ হারান। ইস্পাহান দখল  হয় ভীষণ রক্তপাতের মাধ্যমে,একদিনে সত্তর হাজার ইরান সন্তান তৈমুরের নৃশংস বাহিনীর শিকারে প্রাণ হারান, নারীরা ভোগ দখলে পরিণত হয়। দিনটি ছিলো সোমবার। 

জাফরনামা গ্রন্থে উল্লেখিত যে,১৩৮৭ খ্রিষ্টাব্দে ১৮ই নভেম্বর  রক্তপাত ফলের নদীর শ্রোতের মত ধারা প্রবাহিত হইয়েছিল। তৈমুর সেই রক্তের নদী অতিক্রম করে পরের মাসে অর্থাৎ ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের শিরাজে পৌছে বিনা বাঁধায়। শিরাজের মদ্য তৎকালে পৃথিবী বিখ্যাত, তার নাম শিরাজি। 

এটা লাল মদ ছিল, সমগ্র এশিয়া, আফ্রিকা এমনকি ইউরোপেও এ মদের খুশবু স্বাদ এবং নেশা গিয়ে পৌঁছেছে। শিরাজের প্রায় ঘরে ঘরে মদ চোলাই করা হত, তৈমুর বাহিনী শিরাজে প্রবেশ করে বাতাসে মদের গন্ধ পায় আর তাতে তারা নেশায় বিভোর হয়ে হত্যাকাণ্ডের কথা বেমালুম ভূলে গেল। নৃশংস মনও মৌজে মৌ মৌ করে টগবগ করে উঠেছিল। 

সকলে ঘরে ঘরে খুঁজছে কেবল মদ আর শিরাজের তুর্কিবালা আর মুখে আউড়াচ্ছে হাফিজের কবিতা-


"আগর আঁ তুর্কিই শিরাজী বদস্ত আরদ দিলে মারা,

বখালে হিন্দুয়শ বকশম সমরখন্দ ওয়া বোখারা"


"اگر آن ترک شیرازی بدست آرد دل ما را  

به خال هندویش بخشم سمرقند و بخارا"


"যদি সেই শিরাজের তরুণী আমার হৃদয় দখল করে,  

তবে তার একটিমাত্র কালো তিলের বিনিময়ে আমি সসম্মানে সামরকন্দ ও বুখারা দান করব।"



তৈমুর লঙ্গ জীবনে কখনও কবিতার ছুঁয়ে দেখেনি, কবি, গায়ক ইত্যাদিকে রাস্তায় ডাস্টবিনের কুকুর মনে করতেন। কিন্তু কবিতা ও গান চিত্ত বিভ্রম করে দিতে পারে,এমন সৈন্য বাহিনীর মনকে নৃশংসতা থেকে উদাসীন করে দিতে পারে কিংবা একেবারেই হিংস্রতাশূণ্য করে দিতে পারে তা দেখে তাজ্জাব হয়ে গেলেন।

কেতাবে কবিদের প্রতি বদ দোয়া রয়েছে তা তিনি  জানতেন। কবি মানে বাউরা-উদ্ভ্রান্ত,

উদ্ভ্রান্ত ব্যাক্তিরা পথে-ঘাটে ঘুরে ঘুরে 'যা নয় তা বলে' এ ধারণা তার দৃঢ়মূল ছিল। 

কিন্তু একি! তার হাতে গড়া হায়েনা ব্যাঘ্র সেনারা এখন প্রতিনিয়ত উচ্চারণ করছে "আগর আঁ তুর্কিই শিরাজী....." আর তুর্কি সুন্দরীর গালের তিলের বিনিময়ে সমরখন্দ ও বোখারা অর্থাৎ তৈমুরের নিজ শহর,প্রিয় নগর ও রাজধানী বিলিয়ে দিতে চাচ্ছে প্রতিমুহুর্তে।

 তৈমুর ক্ষিপ্ত হয়ে হুকুম দিলেন, "ধরে আনো সেই কমবখত কবিকে,যে এমন কথা লিখেছে, 'যে আমার বাহিনীতে এই ষড়যন্ত্রের মন্ত্র দিচ্ছে,তার মুন্ডু চিবিয়ে শিরাজের উৎকৃষ্ট মিনায়েন শাবরের সঙ্গে চাট হিসাবে খেতে  হবে"।

এদিকে হাফিজও শুনেছেন বিশ্বত্রাস তৈমুর লঙ্গ তাঁর প্রিয় নগরের বুকে রক্ত প্রবাহিত করতে প্রবেশ করেছে। ভয় একটু লাগলেও মন তার উন্মনা উদাসীন,মাঝে মাঝে দূমড়ে যাচ্ছে বুকের রক্ত,কিন্তু করার তো কিছুই নেই,তাই উদাসীন চিত্তে রুখনাবাদ নদীর তীরে বসে আছেন,ঢেউ গুনছেন।

সময় যাচ্ছে আর প্রতি ঢেউয়ের ভ্রুতে তৈমুরের কুটিল খুঁজছেন।

 হঠাৎ কয়েকটা ঢেউ সূর্যরশ্মিতে জ্বলে উঠে বলল-  "একটা শিংওয়ালা বলিবর্দ অনেক কিছু তছনছ করে দিতে পারে,গোলাপও চিবিয়ে খেতে পারে,তবে তার চোখের সামনে লাল বনাত ঝুলিয়ে দিতে পারলে,হিংস্রতা ঐ বনাতের উপর কেন্দ্রভূত হয়ে যাবে",হাফিজ এমন ভাবছেন আর মুসাল্লার গোলাপ বাগানে বসে গুল আর বুলবুলের প্রেম বিনিময় উপভোগ করছেন।  পরক্ষনে এ প্রেম যে তৈমুরের আঘাতে হারিয়ে যাবে তা অনুভব করে তার মন চৌচির হয়ে গেল। ফুলের পাপড়ি ঝরে পড়া নদীর স্রোতের দিকে তাকিয়ে কেবলই শিরাজের তুর্কি নারীর রূপ সৌন্দর্যের বাখানী ভাব মনে আসছে।

এমন সময় তৈমুরের লোকজনের "এ তো হাফিজ' বলে, তাঁকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলল। ইতিপূর্বেও পারস্যের কোনো সুলতানের লোকজন তাকে পাঁজাকোলে করে নিয়ে তাকে শাহী দরবারে হাজির করতে এসেছিলেন,হাফিজ তখন তাদের তাঁর শব্দজাল এবং সূরার জাদুতে কাবু করে দিয়েছেন। তারা কিছুই করতে পারেন নি। কিন্তু মঙ্গলরা শিংওয়ালা গরু,তারা কবিতার শব্দ কী কিংবা সুরের মন্ত্র কী কিছুই জানেন না। 

কারণ গান ও কবিতা তাদের জন্য হারাম। বলতে গেলে নেকড়েদের মতো শিকারের নেশায় তারা মারমুখো, সুন্দর কিছু দেখার তাদের সুযোগ নেই। কেবল রক্তপাত এবং নৃশংস উন্মাদনাই তাদের প্রসঙ্গ। 

তাই একটা হরিণ শিশু কিংবা 'রিংডোব' অর্থ্যাৎ চন্দন ঘুঘু তারা সহজে শিকার করতে পারে। পা ধরে টেনে বা দু'ডানা বেঁধে ঝুলিয়ে নিতে থাকে, তেমনি কবিকে নিয়ে হাজির করল নৃশংস তৈমুরের সামনে।  তৈমুর তাকে দেখে রেগে মস্ত হাক ছাড়তে পারতেন, কিন্তু কবির দূরাবস্থা দেখে ঠোঁট বাকিয়ে একটু শ্লেষাত্মক হাসলেন, বোধহয় জীবনে এটাই তৈমুরের  প্রথম হাসি,কিন্তু তাতে তবুও তার দাত দেখা যায়নি,হাসিটাকে চেপে রেখে কবির পিছমোড়া হাত হাত বাধা তবু উদ্ধত শির অথচ নাজুক শরীর,বারবার মেঘে গ্রাস করা সূর্যের মত মুখ দেখে তাজ্জব হলেন।

বোধহয় প্রথম কারও প্রতি মন নরম করার ইচ্ছা পোষন করলেন,হাফিজের মুখের দিকে তাকিয়ে ঝলসে গেলেন, তবুও তো তিনি তৈমুর!

তাকে কোনও কিছুতে কাবু করার জিনিস দুনিয়াতে তৈরী হয়নি।

স্বভাব ক্ষুদ্ধস্বরে বললেন "এই বুঝি হাফিজ! কিহে তুমি নাকি? 

"বালে বন্দেগী মুল্লায়েন" অর্থাৎ "জি হুজুর আমি আপনার সেই সেবাদাস"এ  অর্থ দুটো, একটা হল হুজুরের পদসেবা করতে প্রস্তত রয়েছি,দ্বিতীয় অর্থ হল, হাত বাঁধা তবুও খোড়া পায়ের সেবা পা দিয়ে হলেও করার জন্য হাজির।

তৈমুর এত ফার্সি জানতেন না। কেবল প্রথম অর্থ তার থেকে সংগ্ৰহ করলেন,তবুও খুব রেগে বলতে লাগলেন, "তাহলে কোনো আক্কেল তুমি আমার দু'টি আখিঁ উপড়ে নিয়ে সামান্য এক তুর্কি বালিকাকে উপহার দিতে চাও?"


তৈমুরের দুটি আখিঁ হল সমরখন্দ ও বোখারা নগরী।

মধ্যএশিয়ার এই শ্রেষ্ট দুটি নগরী তৈমুর সৃষ্টি করেছিলেন।

ঐতিহাসিকগণের দৃষ্টিতে এই দুই নগরী হল এশিয়ার রোম ও প্যারিস অথবা তাদের চেয়েও উৎকৃষ্ট। 

মধ্য যুগে পৃথিবীর শ্রেষ্ট ধনবান এবং ঔজ্জ্বল্যদীপ্ত সমরখন্দ ও বোখারা। তৈমুর পুরো দুনিয়ার বিজিত সব অঞ্চলের সমস্ত ধন সম্পদ এনে এখানে জড়ো করছিলেন। শুধু কি ধনসম্পদ?  দুনিয়ার শ্রেষ্ট গুনি জ্ঞানী,সৌন্দর্য পিপাসু লোকদের এবং তাদের সঙ্গে শ্রেষ্ট সুন্দরী নারীদেরও সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন।

বিখ্যাত ঐতিহাসিকদের ভাষায়,সমরখন্দ ও বোখারা কেবল বিশ্বের শ্রেষ্ট যোদ্ধা তৈমুরের দুই আখিঁ ছিল তা নয়,বরং সারা বিশ্বের আখিঁ তারা ছিল।

সমরখন্দ ও বোখারা দিয়ে পুরো দুনিয়া দেখা যেত,অর্থাৎ সারা বিশ্বের ধন সম্পদ, জ্ঞানী গুনী এবং সৌন্দর্য্যের জমায়েত ছিল এখানে।

এহেন দুই নগরীর এই দশা করে দিয়েছেন হাফিজ!

তাই তিনি কাচুমাচু হয়ে বলতে লাগলেন "হুজুর এই তো আমার চরম দূর্ভোগের কারণ,এই হতভাগা তাই তো নাস্তানাবুদ, কারণ এই করে করে বিলিয়ে দিয়ে দিয়ে নাদান কমবখত আমি বেশুমার বেহিসেবী হয়েগেছি, বলতে গেলে একদম ফতুর হয়ে গেছি,

বিলাতে বিলাতে আজ আমার কিছু নেই।

আপনি হলেন হুজুর দুনিয়ার অধিপতি, আমি আপনার সামনে হাজির,কিছু বিলাতে পারতেছি না,কারণ আমার হাত পা বাঁধা"।


এ কথা শুনে তৈমুর খুশি হয়ে গেলেন, আদেশ দিলেন কবির হাত পা খুলে দিতে।

বলতে গেলে দুনিয়ার অন্যতম সেরা কবির শানিত শব্দের কাছে নৃশংস তৈমুরও পরাজিত হলেন।

তৈমুর বললেন " ব্যাটার বাধন খুলে দাও তো দেখি, সে কি বিলোতে পারে?"

হাত পা খুলে দেয়ার পর কবি হাফিজ বা হাত বুকে রেখে মাথা নত করে ডান হাত দিয়ে তৈমুরকে তিনবার কুর্নিশ করলেন।

কবি কুর্নিশ বিলিয়ে দিলেন!

স্মিথ হেসে তৈমুর তার কোষাধ্যক্ষকে আদেশ করলেন "কবি দুই হাতে যা নিতে পারে,এই মুহুর্তে সে রকম রত্নরাজি তার সামনে দাও, দেখি তার ইচ্ছা কী!

হাফিজের সামনে ধনরত্ন যা দিলেন,সব ছিটিয়ে দিলেন চারিদিকে,লোকজন তা লুটে নিল।

তবে অন্য ঐতিহাসিক বর্ননা করেছেন যে, কবির বাধন খুলে দেয়ার পর তিনি ধনসম্পদের দিকে থাকাননি, বরং উন্মুক্ত তরবারি হাতে দাড়ানো সৈন্যদের তরবারির ধার পরীক্ষা করে বলেছিলেন "ধার দিয়ে কি হবে?

শিরাজ নগরের একটা প্রানও যেন এই ধারের তলায় পড়ে প্রান না হারায়"

তৈমুর কবির আর্জি কবুল করে শিরাজ নগরে আর হত্যাযজ্ঞ চালায়নি, কবিকে পাশে বসিয়ে নিজ হাতে শরাবের পেয়ালা তুলে দিয়েছেন, যা তৈমুরের মত বিশ্বত্রাসের কাছে অকল্পনীয় ব্যাপার ছিল।

এদিকে ঐতিহাসিক ব্রাউন বলেন কবি তার কবিতার ব্যাখ্যায় তৈমুরকে বলেছিলেন " হুজুর প্রথম লাইন ঠিক আছে, কিন্তু পরের লাইন আমি এরকম বলিনি।

বরং পরের লাইনটি হবে -

"বখালে হিন্দুয়শ বকশম দো মন কন্দ ওয়া সি কোর্মারা"

 অর্থাৎ গালের তিলের বিনিময়ে আমি দুই মন ঘি ও তিন বস্তা খেজুর বিলিয়ে দিব।

তবে এটি এতটা হাস্যকর এবং হালকা যে, বিশ্বাস করা কঠিন, কারণ বিশ্বকবি হাফিজের মুখে এমন সস্তা রচনা আদতে উঠতে পারে না।


তবে জবাব যেটাই হোক, হাফিজের কবিতা বিশ্বের সেরা দুদুর্ষ যোদ্ধার বিশ্বযুদ্ধকে থামিয়ে দিয়েছিল, তৈমুরের মত ইতিহাসের নৃশংস এক সেনাপতিকে ঢলিয়ে দিয়েছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।


কবির আরো মজার বাস্তব কাহিনী জানতে চোখ রাখুন...

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

buttons=(Accept !) days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !